কালো জীবনের গল্প-জিসান হক জয়া
কালো জীবনের গল্প
-জিসান হক জয়া
গায়ের রঙ ফর্সা করার ক্রিম মাখাতে মাখাতে আমি বড় হয়েছি। একটু বড় হতেই এসব মাখতে শুরু করেছিলাম। তখন থেকে মা-ই কিনে দিত। নিয়মিত খোজ রাখত ক্রিম মাখাচ্ছি কিনা তিনবেলা করে। সেইসাথে কাচাহলুদ দুধেরসর থেকে শুরু করে কত কিযে মেখেছি আমি সর্বাঙ্গে তার ইয়ত্তা নেই। আমার সমস্যা একটাই। আমি কালো। গায়ের রঙটা যদি কিছুটা ছাড়ে তবে দেওয়াথোওয়ার পরিমান হয়তো কিছু কমবে এই ভাবনায় তারা সবসময় তটস্থ থাকতেন।
বুঝ হবার পর থেকে আমি বুঝেছি আমাকে কেউ পছন্দ করেনা। কারণ আমি কালো । কিছুটা বড় হয়ে বুঝতে শুরু করলাম মাবাবাও আমাকে নিয়ে লজ্জিত। আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে তারা সংকোচবোধ করতো। কারনও ছিল। কোন আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের বাসায় গেলে আমার সামনেই জানতে চাইতো আমি এতো কালো কেন? কার কাছ থেকে পেলাম এই রঙ। তারপর গবেষণা চলতো পূর্বপুরুষ কে ছিল এই গায়ের রঙের।
তখন থেকেই আমি ভেতরে ভেতরে সংকুচিত হতে শুরু করেছিলাম। আমার বয়স কত আর হবে; সাত কি আট! সবার সাথে কথা বলতে বা চলতে পারতাম না।
আশেপাশের বাড়ির অন্য বাচ্চারা যেমন সতঃস্ফুর্তভাবে খেলতো স্কুলে যেতো, আমি ওভাবে আর পারছিলাম না। আমার সবকিছুতেই কেমন দ্বিধা হোত। ভয় হোত। সবকিছুতেই কেমন লজ্জিত হতাম। খুব অসহায়বোধ করতাম। ফলে আমি খুব কাঁদুনে হয়ে হলাম। কিছু হলেই চোখ ছাপিয়ে জল গড়াতো।
এই অবহেলা আর অসহায় অবস্থার মাঝে আমি বাড়তে লাগলাম। এটা আরো গাঢ়তা পেল যখন স্কুলের গন্ডি ছেড়ে কলেজে পা রাখলাম কেবল। মা বাবা হন্যে হয়ে পাত্র খুঁজতে লাগলো আমার বিয়ের জন্য।
এমন কিন্তু নয় যে আমার চেহারা খুব খারাপ ছিল। আমার চোখ ছিল পটলচেরা, মাথাভর্তি দীঘল কালোচুল, একহারা গড়ন। আমি লম্বা ঠিক যেমনটা সবাই খুব চায়। শুধু আমি কালো বলে সবার কাছে অবহেলার পাত্রী।
এই অবহেলা আরো স্বচ্ছতা পাচ্ছিলো আমি যখন কলেজের শেষের দিকে। মানে তখন আমি 'বড়'র খাতায় পরেছি। বিয়ের যোজ্ঞি মেয়ে হয়ে গেছি। কিন্তু ‘এমন কালো মেয়েকে বিয়ে করবে কে’ একথা শুনতে শুনতে আমি একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন পার করছিলাম।
বুকটা ভেঙে পরতো আমার।
বান্ধবীরা ওই বয়সে সাজতে শিখল।আমিও সাজতে খুব পছন্দ করতাম। ফ্যাশন ষ্টাইল কি বোঝার বয়স আমারও হোল। কিন্তু আমি সাজতে বা কিছু কিনতে গেলে ঘর পর দোকানী কে নয় যে আমাকে মনে করিয়ে দিতো আমি কালো। সব আমায় মানায় না।
প্রেমের আবির্ভাব ঘটতে লাগলো কলেজের সবার মনে প্রাণে দেহে। আমারও খুব ইচ্ছে হোত কেউ আমাকে লুকিয়ে একটা ভালবাসার চিঠি দিক। যাওয়া আসার পথে এবাড়ি ওবাড়ির ছাদে জানালায় কেউ আমার চোখে পড়লেই আমি আয়নায় নিজেকে দেখতাম আর সবার মত। আমার মন ভেঙে খানখান হোত। পাড়ার ফালতু ছেলেরা কেবল তামাশা করা ছাড়া কখনো আমাকে কোন চিঠি দেয়নি। বহুবার নানান বিশেষণভরা ডাকও আমি কান্না চেপে হজম করেছি।
মাবাবা কিন্তু কলেজের প্রথম দিন থেকেই মেয়ের বিয়ে দেখার বিজ্ঞাপন আত্মীয় বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আসছিলো। আর একারনে আত্মীয় বন্ধুদের বাড়িতে মাঝেসাঝে আমাকে নিয়েও যেত। আমি গিয়ে কতটা অসহায় হয়ে থাকতাম মা বোধ করি একবারও ভাবেননি।
কিছুদিন বাদে আমার হৃদয়ের বাকিটুকু ঝাঝড়া করতে শুরু হোল আরেক হাতুড়ি পেটা। পাত্রী দেখার নামে সেজেগুজে নিজেকে যত্রতত্র প্রদর্শন করতে হোত প্রায়ই। বলার অপেক্ষা রাখে না সবাই আমাকে ফ্লপ সিনেমার মত দেখে চা পানি পোলাও বিরিয়ানি চেটেপুটে খেয়ে নির্লজ্জের মত জানিয়ে দিত 'মেয়েটা খুব কালো'।
সেদিন বাবার ব্যথাতুর চেহারার দিকে তাকানো যেতো না। চুপচাপ কি যেন কেবল ভাবতো। কেমন নির্লিপ্ত! কিযেন বলতে চাইতো। মায়ের অভিব্যক্তি ছিল আমাকে পিষে ফেলার মত। কথার বানে জর্জরিত করে ফেলতো আমাকে। আমি সেদিন আআর ঘর থেকে বেরুতেও সাহস পেতাম না। আমার সেদিন না হোত খাওয়া না ঘুম। বুকের ভেতরর ঢিপঢিপানি আমি যেন কানেও শুনতে পেতাম। আমাদের মফস্বলের বাড়িগুলোতে তখনো আশেপাশের বাড়ির সাথে সখ্যতা থাকতো। পাশাপাশি মৃদু হিংসে বা কথাচ্ছলে খোঁচানোর একটা চল ছিল। কোনবাড়িতে কোনকিছুই গোপন করার উপায় থাকতো না। সেইদিনগুলোতে প্রতিবেশিরাও যোগ দিত আমাকে ছিন্নভিন্ন করার উৎসবে।
এমনই একদিন।
বেশ ক'দিন যাবত অদৃশ্য ঢাকঢোল পিটিয়ে এলেন এক মা তাঁর মোটামুটি সুদর্শন পুত্রকে নিয়ে। সাথে তেমন কেউ না। মা ছেলে সাথে আর মাঝবয়সী দুজন মহিলা। আমার মা একদিন আগে থেকেই বাড়িমাত করছিল মাংশের সুঘ্রান আর নানান পদের রান্নার আয়োজনে। বাবা তার ক্লান্ত শরীরের উপর অনবরত অত্যাচার করে চলছিল বারবার দোকানে যাওয়া, সদাইপাতি আনায় ব্যস্ত রেখে। সেদিন সকাল থেকে ছোট ভাই অপু বারবার আমার ঘরে উকি দিচ্ছিল ওর বউ মিতু আমাকে স্নো পাউডার ঠিকমত মাখছে কিনা। আজকের মিশন সফল হয় কিনা। যদিও আমি জানি সবাই মনে মনে ধরেই রেখেছে কি হবে। তবুও চেষ্টা করা আরকি।
অবশেষে তাঁরা এলেন। গুরুগম্ভীর পরিবেশ। আমার মাবাবার ভয়ার্ত মুখে কেবল একচ্ছত্র কৃত্রিম হাসি। একথা সেকথার পরই আমাকে আনতে বললেন তাঁরা। যেন তাদের 'না' বলতে দেরি সইছিল না। তাঁরা আগেই খেতে চাইলেন না। আমাকে দেখে তবেই খাবেন বলে জানালেন। মা ভেতরে এলেন আমাকে নিতে। দোয়া দরুদ পড়লেন। সব দেখলেন আমি ঠিক আছি কিনা। কিন্তু মুখের শেষ ভাবে আভাস ছিল 'কোন লাভ নেই'। মন চাইছিল ছুটে কোথাও পালিয়ে যাই কিংবা একশিশি বিষ মুখে পুরে এদের উদ্ধার করি। পারিনি আমি। কে যেন আটকায় আমাকে।
মা আমাকে ধরে নিয়ে এসে বসালেন তার পাশে।। পাত্র আর তার মা হবেন হয়তো, পাশাপাশি এক সোফায় বসেছিলেন। তার উল্টোদিকে মায়ের পাশে আমি। আর দু'জন অন্যদিকে দুটো চেয়ারে। বাবার একটা চেয়ার আছে বটে কিন্তু উনি দাঁড়িয়েই আছেন। মনে হচ্ছিল বসলে যেন তাঁর তোষামোদি কমে যাবে। পিনপতন নিরবতা কিছুক্ষণ। উল্টোদিক থেকে পাত্রের মা হেটে আমার কাছে আসতেই মা তাঁর জায়গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে তাকে বসার সুযোগ দিলেন। উনি পাশে বসে আমার হাতে হাত রাখলেন। আমার আঙুলগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একবার শুধু আমার নাম ধরে ডাকলেন একবার "পারু"। নামটা হয়তো বায়োডাটা পড়ে জেনেছেন। আমার বুকের হাতুড়ি পেটার শব্দ কি শুনে ফেলছেন কিনা আমি সে ভয়ে বারকয়েক ঢোক গিলছিলাম। তাঁর হাতের ভেতর থাকা হাতসহ সর্বাঙ্গ ঘেমে নেয়ে আমি একাকার হচ্ছিলাম। প্রচন্ড তৃষ্ণায় আমার গলা ধরে আসছিল। এমনই একসময় তিনি নিজের হাত থেকে মোটা একজোড়া বালা খুলে একেক করে আমার দুহাতে পড়িয়ে দিলেন।
আমি কিছুটা সময়ের জন্য আসলে জ্ঞানহারা ছিলাম। চোখে ঠিক না ভুল দেখছিলাম সে বুঝতে অনেকখানি সময় নিলো আমার বোধ। আমার বাবা ধরা গলায় কি যেন বললেন।
আমার মুখময় হাত বুলিয়ে তিনি আমায় বললেন, "আমি তুমারেই খুঁজতেছিলাম পারু। আমার ঘর তুমি আলো করবা। মা করবা না?"আমি কি মনে করে হ্যা সূচক মাথা নাড়লাম। খানিক বাদে বললেন, আইজ এক শুক্কুরবার। আপনের যদি কোন অসুবিধা না থাকে তাইলে সামনেত শুক্কুরবার.....।
আমার মাথা কেমন দুলে দুলে উঠছিল। নিজের চোখ কানকে অবিশ্বাস করছিলাম। চোখ ছাপিয়ে জল.....সত্যিই কি......
একসপ্তাহ মাত্র। কিভাবে কি হোল, কিভাবে দিনগুলো চলে গেলো, জানিনা।
একহেমন্তের সন্ধ্যায় তারা আমাকে নিয়ে গেলেন। অল্পকিছু লোকজন নিয়ে ছোট্ট করে আয়োজন ছিল। তবে গা ভর্তি গয়নাপত্তর ছিল আমার। গতক'দিন যে কানাঘুষা চলেছে প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের মাঝে তার কতটা কি দিতে হয় তাদের সেই ভাবনা। কিন্তু তিনি পরিষ্কার জানালেন কিছু দাবী নেই তাঁদের। যা ছিল সবার কাছে এক অতি আশ্চর্য ঘটনা। তবু সবাই ধরেই নিয়েছিল বিয়েরদিন তারা বিরাট ফর্দ ধরিয়ে দেবে বাবার হাতে। কিন্তু সেদিনও দিল না। তারপরও ধারনা করে রেখেছে হয়তো আমাকে নিয়ে যাবার পর জানাবে আর না দিলে আমাকে অত্যাচার করে আদায় করবে।
কিজানি! হতেও পারে। আমি আজীবন এমনই শুনে বড় হয়েছি যে,আমাকে বিয়ে দিতে গিয়েই ভিটে মাটি সব খোয়াতে হবে বাবাকে। কারন আমি কালো।
ওবাড়িতে গিয়ে উঠলাম শুন্যহস্তে। মনে শংকা। এই বুঝি তিনি ধরিয়ে দেবেন ফর্দ। টিভি ফ্রিজ খাটপালং নাকি ছেলের ব্যাবসার টাকা বা বিদেশ যাবার খরচ। কিন্তু আদতে তারা কিছুই চাইলেন না। তবুও আমার বাবার বাড়ির সবাই ধরেই রেখেছেন তারা চাইবেনই। সেই মতো হাতে বিষয়াদি নিয়ে বসে আছেন। কালোমেয়ের চেহারা দেখে উনত্রিশ বছরে তারা খেয়ে না খেয়েতো কম জমাননি।
বাসরশয্যা শেষ হোল আমার। অতি সহজসরল সাধারণ এক মানুষ আমার সাথে জুটেছে বুঝলাম। আমি এরচেয়ে বেশি কিছু আসলে আশা করতেও চাইনি। একটা কথাই অনুরোধ করলেন। আমি যেন শাশুড়ি মায়ের দিকে খেয়াম রাখি।
ভোরবেলায় বিছানা ছেড়ে জানালায় দাঁড়িয়ে কেমন স্বপ্নের মত লাগলো সব। আমি এ কার ঘরে! কার বিছানায়!
ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। ঘরময় হাটলাম। খুব আতিশয্য নেই। তবে কোন কমতি নেই ঘরে। তবে প্রতিটা জায়গায় যত্নের ছাপ। আমার মন আবার সেই ভাবনায় গেল। কি চাইবেন তবে আমার বাবার কাছে। আমার চিন্তাগুলি টলমল করছিল শুধু।
ওরা দুইবোন আর এই একটি ভাই। বাবা গত হয়েছেন বেশ কয়েকবছর একবোন দেশের বাইরে। আরেকজন শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় রাতেই চলে গেছে। তারাই বা কি করবে আমার সাথে।
কাধের'পরে একটা হাতের ছোঁয়ায় ভাবনায় ছেদ পড়লো। পেছন ফিরে দেখলাম আমার নতুন মা। টুকটাক কথা হোল। আমি দেখলাম কেমন একটা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি আমার দিকে। আমি বুঝে পেলাম না সেই দৃষ্টির অর্থ। কি আছে সেখানে! ভালোলাগা নাকি মন্দলাগা। আমার বর্নকে ধারণ করা নাকি বর্জন করা।
চাওয়া-পাওয়ার সে শংকা আছেই আমার মনে।
আমাদের প্রাত্যাহিক জীবন শুরু হোল। নয়ন মানে আমার বর অফিসে চলে যেতো। তারপরই শুরু হোত আমাদের সাংসারিক কাজকর্ম। খুব অল্প দিনেই আমি একটা জিনিষ আবিষ্কার করলাম। নতুন মা সারাক্ষণ আমাকে তার পাশেপাশে রাখতে চান। প্রথম কিছুদিন ভাবলাম আমি নতুন তাই। কিন্তু দিন যেতে লাগলো আমিও দেখলাম এটাই তার রুটিনবাঁধা হয়ে যাচ্ছে। নয়ন ঘরে থাকলে তেমন ডাকেন না।বরং খুব চাইতেন আমি নয়নের পাশেই থাকি। কিন্তু যতক্ষণ সে না থাকে, মা আমায় তাঁর কাছাকাছিই রাখতে চান। খেতে, টিভি দেখতে, কাজেকর্মে পান খেতে বসে সবসময় আমাকে তাঁর পাশে চাই। এমনকি দুপুরে ভাতঘুমটুকুতেও আমাকে তাঁর পাশেই ডাকেন। এর মানে কি আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। আর যখনই আমাকে ডাকেন আমার বুকের ভেতর সেই কাঁপন শুরু হয়, এই বুঝি ধরিয়ে দেবেন সেই চাহিদার ফর্দ।
আমাদের দিন যাচ্ছিল নানান গল্পে। আমার অতীত তাঁর অতীত ছেলেমেয়ে মানুষ করা আমার শ্বশুরের গল্প সব আমি শুনতাম। বেশিরভাগ সময় মা আমার একবারে কাছে বসতেন। শুধু তাই না। আমার হাতদুটো নাড়াচাড়া করতেন, চুলে তেল দিয়ে দিতেন। আমার গায়ের বিভিন্ন জায়গা খুঁটিয়ে দেখতেন আর যত্ন নিতে বলতেন। কখনোবা নিজেই লেগে পড়তেন যত্ন নিতে। আমি বুঝতাম না সেই যত্নের সাথে কি 'আদর'ও মিশ্রিত ছিল কিনা। একবার মনে হোত এখানে আছে গভীর ভালবাসা আবার মনে হোত শাশুড়ি কি কখনো এতো আদর করতে পারে। নিজের বাবামায়ের কাছে চরম অবহেলায় বেড়ে ওঠা আমি আসলে কারো ভালবাসা পাবো, এ আমার ভাবনায় কখনো আসেনা।শুধু তাই না, পাড়াপ্রতিবেশি আত্মীয় সবার কাছে আমার সকল গুনের কথা বলে বেড়াতেন। ফলে আমি খুব অল্পদিনেই সবার কাছে ভীষণ প্রিয় আর আদরের হয়ে উঠলাম।
কিন্তু তারপরও সে ভাবনা ছেড়ে দিতে পারিনা। একটা বিস্কিটও আমাকে না দিয়ে খান না। আমাকে মুখে তুলে বহুদিন খাইয়ে দিয়েছেন। আমার জন্যে নিজহাতে একটা শাড়িতে সুতোয় কাজও করে দিলেন। তার ছেলেকে ডেকে বলেন আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে, কিছু কিনে দিতে। ভোরে হাটতে বেরুলে আমার কখনো ফুল, কখনো বাদাম বা দুটো চুড়ি কখনো একটা ম্যাকসিও নিয়ে আসেন। ঘরে যতক্ষণ থাকেন কিছুক্ষণ পরপরই ডাকতে থাকেন "পারু ওমা পারু"।
আমি এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেলাম কিছুদিন বাদে। মাঝেমাঝে এমন হতো আমার কানে এমনিতেই সে ডাক বাজতো। অনেকসময় বিরক্তিও ধরে যেতো। খেতে ঘুমাতে পান চিবুতে একডাক "পারু ওমা পারু"। ভাবতাম আমাকে ছাড়া এতোদিন কিভাবে গেল তাঁর? তবে বেশিরভাগ সময় তাঁর আদর উপভোগ করতাম কাংগালের মত। আমার সারাজীবনে পাওয়া ভালবাসা। একটা সময় ভুলতে থাকলাম আমি কালো সেই কথা। সেও ছিল তার ভালবাসার দান। আমি বুঝলাম কালোমেয়েকেও কেউ ভালবাসতে পারে। এই বিশ্বাসের ভিত আমার মাঝে তৈরী হতে লাগলো। নয়ন আমাকে ভালবাসতো। আমাকে তারচেয়ে অনেকবেশি ভালবাসে নতুন মা।
তবে এতোকিছু এতো আদর তবুও আমার মনের বাঘ আমাকে কুড়েই খায় দিনরাতে। এই বুঝি মা বলে পাঠাবেন সেই ফর্দের কথা।
এর মাঝেই অপার এলো আমার কোল জুড়ে। আমার ঘর তখন স্বর্গ। বছর দুয়েকের ব্যবধানে দিগন্ত আসার খবর দিলাম মাকে। আমাকে খাইয়ে দেয়া থেকে শুরু করে অপারের যত্নআত্তি সব মা একাই সামলান। ততদিনে আমার সংসারের বয়স সাড়ে পাঁচবছর।
দিগন্ত যখন ছ'মাসের আমার পেটে, একরাতে মা তার ছেলেকে ডেকে তুললেন তাঁর শরীর খারাপ লাগছে বলে। এম্বুলেন্স আনিয়ে নয়ন মাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। ফিরে এলো ঘন্টাখানেকের মধ্যেই। মা সাদা কাপড়ে মোড়ানো।
আমি জানি না আমি সেদিন থেকে পরের কয়েকটাদিন কিভাবে কোথায় গেল। আত্মীয়স্বজন যখন সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে যে যার মত চলে গেল আমি বুঝলাম কি আমি হারিয়েছি। আমি কেমন যেন শুন্যে পড়ে গেলাম। আমার আর কিছুই ভাল লাগে না। নয়ন আমার অপার আমার দিগন্ত কেউ আমাকে নতুন মায়ের সেই আদরে ভোলাতে পারেনা। আমি সারাক্ষণ কানে শুনতে পাই নতুন মায়ের নরম গলার ডাক "পারু ওমা পারু"। আমি না পারি খেতে না পারি ঘুমাতে। জগৎ সংসার আমার কাছে তিৎকুট লাগতে শুরু করলো। রাতভর জেগে থাকি। তন্দ্রার মাঝেও মায়ের গলা স্পষ্ট শুনি। তাঁর হাটার শব্দ পাই। মা আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছেন আমি অনুভব করি। কেউ গল্প করছেন শুনি। হাসির আওয়াজ শুনি। আমি হররোজ শুনি মা রান্নাঘরে টুংটাং আওয়াজ করে রান্না করছেন। আমাকে ডাকলেন লবন চেখে দিতে। শীতের দুপুরে অলস বারান্দায় মা বসা।
মায়ের চলে যাওয়ায় আমি আরেক নতুন জীবনে পড়ে গেলাম। কি যে ছিল তাঁর সে ডাকে! কি ছিল সেই বাদামে, ফুলে বা দুটো চুড়িতে! শুধু মাকে খুঁজত আমার মন। ভাবতাম আমার মত কালো একটা মানুষকে কেউ এতো ভালবাসতে পারে! একেই কি নলে আদর! ভালবাসা! আমি আর কি কারো কাছে পাবো এই ভালবাসা? মানুষের ভালবাসার এতোই শক্তি? ভালবাসা কি এমনই হয়?
আজ প্রায় পনেরো বছর। আমি আজও শুনি মা ডাকছেন, "পারু ওমা পারু, আয় মা চুলে তেল দিয়া দেই। তর চুলগুনা শুকায় রইছে।
এই কালো মেয়েটার জন্য তার হৃদয়ে তোলা ভালবাসার দাম আমি দিতে কি পেরেছিলাম? জানি না।
একবিশাল শুন্যতা আমার বুকে এতোটা বছর ধরে।মনে মেঘ হয়ে জমে বৃষ্টি হয়ে ঝরে। কিন্তু ফুরায় না।
Credit: Jissan Joya


কোন মন্তব্য নেই
মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷