https://www.effectivegatecpm.com/rn8qbtaqk?key=a6bb032d522890bffe519fa4928f6d14 শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ - Gaibandha Online Portal

Breaking News

শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

 গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড কার্যত ভেঙে পড়েছে। অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত কর্মস্থলে না পাওয়ায় সরকারি সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ছাড়া মাত্র দু-একজন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও অধিকাংশ সরকারি দপ্তরই ছিল কার্যত অভিভাবকহীন। অফিস কক্ষ খোলা থাকলেও চেয়ার ফাঁকা, ফাইলে ধুলোর আস্তরণ, অপেক্ষমাণ সেবাগ্রহীতাদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ।


শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

দুই দিনের অনুসন্ধানে মিলল অনিয়মের চিত্র

গত দুই দিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পলাশবাড়ী উপজেলার একাধিক দপ্তরের কর্মকর্তা কোনো প্রকার নোটিশ বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ছুটিতে রয়েছেন। কেউ আবার ‘রাস্তায় আছি’, ‘মিটিংয়ে আছি’ কিংবা ‘ব্যক্তিগত কাজে বাইরে’—এমন অজুহাত দেখিয়ে দিনের পর দিন অফিসে অনুপস্থিত থাকছেন।

এছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তা একাধিক উপজেলার দায়িত্বে থাকার বিষয়টি দেখিয়ে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার যুক্তি দিচ্ছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৈনন্দিন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।


জনশূন্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়

  • উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস

  • মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়

  • সমবায় অফিস

  • যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর

এই দপ্তরগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অনুপস্থিত থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাগ্রহীতারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।


সেবাগ্রহীতাদের ক্ষোভ

সরকারি সেবা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাগ্রহীতা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন,

“আমরা কাজ ফেলে, ভাড়া খরচ করে সরকারি অফিসে আসি। কিন্তু এসে যদি কর্মকর্তাদের দেখাই না পাওয়া যায়, তাহলে আমরা কার কাছে যাব? এখানে সাধারণ মানুষের সময়ের কোনো মূল্য নেই।”

আরেক সেবাগ্রহীতা বলেন,

“একদিন না পেলে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু দিনের পর দিন অফিসে কর্মকর্তা না থাকাটা চরম দায়িত্বহীনতা।”


ইউএনওর বক্তব্যে অসন্তোষ

কর্মকর্তাদের এই গণ-অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ জাবের আহমেদ বলেন,

“অফিসাররা না আসায় জনদুর্ভোগ হচ্ছে—এমন কোনো লিখিত অভিযোগ আমি এখনো পাইনি।”

সাংবাদিকের পক্ষ থেকে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানতে চাওয়া হলে—এই বাস্তব চিত্র কি অভিযোগ হিসেবে গণ্য হবে না?—এর জবাবে তিনি জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইউএনওর এমন বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির বিষয়টি কি শুধু লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় থাকবে?


জেলা প্রশাসকের কঠোর হুঁশিয়ারি

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন,

“সরকারি দায়িত্বে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। দায়ী হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যে প্রশাসনের ভেতরে নড়চড় শুরু হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।


বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া

রংপুর বিভাগীয় স্থানীয় সরকার পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবু জাফর বলেন,

“উপজেলা পর্যায়ের এই ধরনের বিষয় মূলত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তদারকির আওতায় পড়ে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, সরকারি সেবায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব।


চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার শঙ্কা

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণে উপজেলা প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে অধস্তন কর্মচারীরাও দায়িত্ব পালনে গাফিলতি দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন,

“উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকলে সেবার মান যেমন নষ্ট হয়, তেমনি পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়।”


স্থানীয়দের দাবি

পলাশবাড়ীর সচেতন নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের দাবি, দ্রুত এই প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দূর করতে হবে। তারা চান—

  • সব কর্মকর্তার নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা

  • অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা

  • উপজেলা পর্যায়ে সেবা গ্রহণের পরিবেশ স্বাভাবিক করা

তাদের মতে, অন্যথায় সরকারি সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

পলাশবাড়ী উপজেলা প্রশাসনের বর্তমান চিত্র শুধু একটি উপজেলার সমস্যা নয়; এটি গোটা স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা না থাকলে সরকারি সেবা কার্যক্রম যে কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে—পলাশবাড়ীর পরিস্থিতি তারই বাস্তব উদাহরণ।

এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হুঁশিয়ারি কতটা দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষ কবে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা ফিরে পায়।

কোন মন্তব্য নেই

মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷