তলে তলে যেভাবে খেলছে জামায়াত
রাজনীতিতে নীরবতা সব সময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়। অনেক সময় এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় কৌশল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে ঠিক এমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রকাশ্যে কম কথা, কম কর্মসূচি—কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিসেবি প্রস্তুতি।
দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত সরাসরি রাজনৈতিক মাঠে চাপে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, মামলার ভার, সামাজিক প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে তাদের চলাচল সীমিত। কিন্তু রাজনীতি তো কেবল মিছিল-মিটিং নয়; রাজনীতি হলো সুযোগ বুঝে অবস্থান নেওয়ার শিল্প। আর সেই শিল্পে জামায়াত যে এখন ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ কৌশল বেছে নিয়েছে, তা স্পষ্ট।
সাম্প্রতিক সময়ের দিকে তাকালেই দেখা যায়, দলটি প্রকাশ্যে সংঘাত এড়িয়ে চলছে। বড় কোনো কর্মসূচি নেই, উত্তেজনামূলক বক্তব্য নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সংগঠন আছে, কর্মী আছে, নিয়মিত যোগাযোগ আছে। জেলা-উপজেলায় নীরবে চলছে বৈঠক, সাংগঠনিক পুনর্গঠন। এসবই ইঙ্গিত দেয়—এটি কোনো স্থবিরতা নয়, বরং প্রস্তুতির সময়।
আরেকটি লক্ষণ চোখে পড়ার মতো—জামায়াত এখন রাজনীতিকে সরাসরি রাজনৈতিক ব্যানারে না এনে সামাজিক ব্যানারে নিয়ে যাচ্ছে। ত্রাণ, শিক্ষা সহায়তা, ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমের আড়ালে জনসংযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এতে একদিকে জনভিত্তি ধরে রাখা যাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নজরদারিও কিছুটা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। রাজনীতির ভাষায় এটাকে বলা যায় ‘লো-প্রোফাইল, হাই-ইমপ্যাক্ট’ কৌশল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভোটের অঙ্কে জামায়াতের অবস্থান। তারা এখনই সব কার্ড খুলে খেলতে চায় না। বরং রাজনৈতিক মেরুকরণ কীভাবে হয়, কারা শক্ত অবস্থানে যায়, সেই হিসাব মিলিয়ে নিজেদের দরকষাকষির জায়গা তৈরি করছে। কোথাও নীরব সমর্থন, কোথাও কৌশলী দূরত্ব—এই দ্বৈত অবস্থান জামায়াতের পুরোনো রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গেই মানানসই।
তরুণদের দিকে নজর দেওয়াও এই কৌশলের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় স্লোগানের বদলে নৈতিকতা, দুর্নীতি বিরোধিতা, আদর্শিক শাসনের গল্প তুলে ধরা হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক পরিচয় আড়ালে থাকলেও বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে। এটি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ—তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে প্রশ্ন হলো, এই তলে তলে খেলা কতটা টেকসই? অতীতের ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের দায় ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে জামায়াতের প্রতি সমাজের বড় অংশের অনাস্থা এখনও কাটেনি। কৌশল যতই সূক্ষ্ম হোক, ইতিহাসের বোঝা উপেক্ষা করে সামনে এগোনো সহজ নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াত এখন সরাসরি লড়াই নয়, বরং সময়ের অপেক্ষায়। প্রকাশ্যে নীরব, আড়ালে সক্রিয়। রাজনীতির দাবার বোর্ডে তারা এখন ঘুঁটি সরাচ্ছে খুব ধীরে, কিন্তু হিসেব করে। এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা ফল দেবে, তা নির্ভর করবে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক গতিপথের ওপর। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—নীরবতা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়, আর জামায়াত সেই কথাই প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।


কোন মন্তব্য নেই
মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷